লবণাক্ততায় হুমকিতে কৃষি, ব্যাহত হচ্ছে গৃহপালিত পশুপাখি পালন
প্রকাশিতঃ ২২ নভেম্বর ২০২৩, বুধ, ৮:৪১ অপরাহ্ণ । পঠিত হয়েছে ২৪৫ বার।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের কারণে সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়াতে সেখানকার কৃষি উৎপাদন এখন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বিলুপ্ত হচ্ছে গাছপালা অপরদিকে খাদ্য সংকটের অভাবে ব্যাহত হচ্ছে গৃহপালিত পশুপাখি পালন। এর ফলে হুমকির মুখে পড়তে পারে খাদ্য নিরাপত্তা বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সাতক্ষীরা জেলা কৃষিসম্প্রসারণের তথ্যমতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সাতক্ষীরার ১ লক্ষ ৮৮ হাজার ৬২৬ হেক্টর আবাদী জমির ভিতরে ৮১ শতাংশেরও বেশি জমি অর্থাৎ এক লক্ষ ৫৩ হাজার ১১০ হেক্টর জমি লবণাক্ততায় রূপ নিয়েছে। আর পতিত জমি রয়েছে ৪০হাজার ৯৮১ হেক্টর।
জেলার উপকূলীয় এলাকার ভিতরে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ সুন্দরবন বেষ্ঠিত শ্যামনগর উপজেলা। এই উপজেলার ৩৭ হাজার ১৪৬ হেক্টর আবাদী জমির ভিতরে প্রায় সাড়ে ৯৯ শতাংশ জমি অর্থাৎ ৩৬ হাজার ৯১০ হেক্টর জমি লবণাক্ততায় রূপ নিয়েছে। এছাড়া সদর উপজেলায় ২৯ হাজার ৩১৯ হেক্টর আবাদী জমির ভিতরে প্রায় ৬৩ শতাংশ, কলারোয়ায় ১৭ হাজার ৪২১ হেক্টর জমির ভিতরে প্রায় ৩৮ শতাংশ, তালায় ২৮ হাজার ৭৭০ হেক্টর জমির ভিতরে ৬৪ শতাংশ, দেবহাটায় ১৪ হাজার ৭৬১ হেক্টর জমির ভিতরে ৬১ শতাংশ, কালিগঞ্জে ২৬ হাজার ৭৫৩ হেক্টর জমির ভিতরে ৯৬ শতাংশসহ আশাশুনি উপজেলায় ৩৪ হাজার ৪৫৬ হেক্টর আবাদী জমির ভিতরে ৯৭ শতাংশ জমি লবণাক্ততায় রূপ নিয়েছে। এতে, একদিকে যেমন লবণাক্ততার কারনে দিন দিন জেলার কৃষিতে বিপর্যয় নেমে আসছে অপরদিকে ব্যাহত হচ্ছে গৃহপালিত পশুপাখি পালন। যার প্রভাব পড়ছে উপকূলীয় এলাকার মানুষের জনজীবনে।
সরেজমিনে জেলার শ্যামনগর উপজেলার দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, এই ইউনিয়নে বসবাসরত ৪৭ হাজার মানুষের অধিকাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, কৃষি জমি নষ্টসহ কর্মসংস্থান না থাকাতে জেলার বিভিন্ন এলাকার চেয়ে এখানে বৃদ্ধি পেয়েছে বেকারত্ব।
দারিদ্র বিমোচনে বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্পের সূচনা করেন। তবে, সে প্রকল্পের প্রসার ঘটানো সম্ভব হয়নি এই ইউনিয়নে।
মূলত, উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধির ফলে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো গাছপালা কমে যাচ্ছে। আর এর প্রভাব পড়ছে প্রাণীকুলে। বিশেষ করে গবাদি পশু লালনপালনের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর জীবন-জীবিকায়। উপায়ন্তর না পেয়ে গৃহপালিত পশুপাখির খাবার সংগ্রহ করতে এখন প্রতিদিনই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ট্রলারে উত্তাল নদী পাড়ি দিতে হচ্ছে তাদের।
এদের-ই একজন গাবুরা ইউনিয়নের সোরা গ্রামের কুলসুম বেগম। ঘূর্ণিঝড় আইলার সময় নদীগর্ভে চলে যায় তাদের বাসস্থান। তার স্বামী আশরাফুল হোসেন ভাগ্য ফেরাতে পারি জমান অনত্র। সেই থেকে আর কখনও ফিরে আসেননি, খোজঁ খবর নেননি কুলসুমসহ তাদের সন্তানদের। বর্তমানে কুলসুম পাউবোর বেড়িবাঁধে বসবাস করেন। পাউবো চাইলে শেষ আশ্রয়স্থলও ছাড়তে হবে তাকে। তবে, কুলসুম আজও জানেনা তার স্বামী আদেও বেঁচে আছে নাকি মারা গেছে।
অনেকটা আপেক্ষ নিয়ে কুলসুম বেগম বলেন, ‘আমাদের খুব কষ্ট। ওই জঙ্গল আর নদী ছাড়া আমাদের কোন লাইন নেই। পাশ বন্ধ থাকলে না খেয়ে মরে যেতে হয়। আর পাশ খোলা থাকলে বিভিন্ন ঝামেলা পোহাতে হয়।’
কুলসুম জানান, এখানে পশু পালন করার কিছু (খাদ্য) নেই। ছাগল গরু পালনের লাইন নেই। চারিদিকে মাছের চাষ আর লবণ পানি। গাজী ড্রামে একটু পানি ধরি (বর্ষার পানি) তাই খায় আর দৃষ্টিনন্দনের পুকুরের পানি দিয়ে রান্না করি। আর হাঁস মুরগি লবণপানিতে সব মরে যায়।
রমজাননগর ইউনিয়নের মঈনুদ্দীন বলেন, ‘আমাদের লবণাক্ততা নিয়ে বসবাস করতে হয়। লবণ পানিতে ধানের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয় জানিয়ে তিনি বলেন, কোনক্রমে যদি জমিতে একবার লবণপানি ঢুকে যায়, তাহলে সে বছরতো ফসল হয়না। বরং সেই পানির প্রভাবে আরও দুইবছর ফসল নষ্ট হয়। ‘
একই ইউনিয়নের মানিকখালী গ্রামের হুমায়ুন কবির বলেন, ‘একদিকে জলবায়ু পরিবর্তনে লবণাক্ততা বৃদ্ধি অপরদিকে উপকূলীয় অঞ্চলে বেড়িবাঁধ কেটে কৃষিজমিতে লবণপানি উত্তোলনের কারনে জমি তার উর্বর শক্তি হারাচ্ছে। আর এসংক্রান্ত কারনে আমি বাদি হয়ে জনস্বার্থে হাইকোর্টে একটি রিপিটিশন দায়ের করি। রিপিটিশনে সরকার পক্ষের পক্ষে রুলস জারি হলেও স্থানীয় প্রশাসনের কোন মাথা ব্যাথা নেই।’
তিনি অভিযোগ করে বলেন, যারা লবণ পানি তোলে বেড়িবাঁধ কেটে, এরা বিভিন্ন ঘেরে পানি বিক্রি করেন লক্ষ লক্ষ টাকার। আর এই পানি বিক্রির টাকার ভাগ পান বাঁধরক্ষার দায়িত্বে যারা থাকেন তাদের প্রত্যেকে। একারনে দেশের সর্বোচ্চ আদালত রুলস জারির পরেও সংশ্লিষ্টরা এটার বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ নেননা।
সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ঘামারবাড়ি) অতিরিক্ত উপপরিচালক হুমায়ুন কবির জানান, লবণাক্ততার প্রভাবে ফসলে সেচের সমস্যা হয়। লবণপানিতে সবধরণের ফসল চাষ করা সম্ভব হয়না। একারনে আমরা বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। ইতিমধ্যে উপকূলীয় এলাকার পতিত জমিতে লবণ সহিষ্ণু জাতের ধান ও সবজি চাষের আওতায় এনেছি। যেটা আগামীতে আরও বৃদ্ধি পাবে বলে জানান তিনি।
সাতক্ষীরা জেলা প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ডা. এ বি এম আব্দুর রউফ বলেন, লবণপানি পশুপাখির জন্য ক্ষতির কারন। বিগত দুইবছর ধরে আমরা চেষ্টা করছি বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে ঘামারিদের লজিস্টিক সাপোর্ট দেওয়ার। তাছাড়া, আমরা ঘামারিদের পরামর্শ দিয়েছি লবণাক্ত পানি পরিহার করে, লবণাক্ত পানিকে পিউরিফাইড করে মিষ্টি পানিতে পরিণত করার জন্য।
সাতক্ষীরা জলবায়ু পরিষদের সদস্য সচিব অধ্যক্ষ আশেক-ই-এলাহী বলেন, পরিবেশ বিপর্যয় রোধে বৈরী জলবায়ুর সাথে খাপ খাওয়ানোর মত লবণাক্ততা, বন্যা, খরা, জলাবদ্ধতা ও অধিক তাপ সহিষ্ণু ফসলের আরও জাত উদ্ভাবন ও আবাদ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি নতুন শস্যপর্যায় ও অভিযোজন কৌশলের ওপর ব্যাপক গবেষণা জোরদার করতে হবে। অভিযোজন কৌশল ও নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে সরকারের নীতি নির্ধারক থেকে শুরু করে কৃষিজীবী সহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সচেতনতা বাড়াতে হবে। আর যারা বেড়িবাঁধ কেটে কৃষি জমিতে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে লবণাক্ততার প্রভাব থেকে জেলার অনেক কৃষি জমি রক্ষা পাবে বলে জানান তিনি।
এ জাতীয় আরো সংবাদ
আগরদাঁড়ী ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থী জিয়ারুল ইসলামের উদ্যোগে ৭৫০ ফুট...
প্রকাশিতঃ ১০ এপ্রিল ২০২৬, শুক্র, ৬:৫৬ অপরাহ্ণ
সাতক্ষীরায় আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভা ও সেলাই...
প্রকাশিতঃ ৮ মার্চ ২০২৬, রবি, ৬:৫৯ অপরাহ্ণ
সাতক্ষীরায় ৫.৪ মাত্রার ভূমিকম্প,উৎপত্তিস্থল আশাশুনি,অসংখ্য দেয়ালে ফাটল,ধ্বসে পড়েছে কিছু...
প্রকাশিতঃ ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, শুক্র, ৮:৪১ অপরাহ্ণ
সাতক্ষীরায় গরু বোঝাই ইজ্ঞিনভ্যান উল্টে চালক নিহত,আহত ৩
প্রকাশিতঃ ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, বৃহঃ, ৮:০১ অপরাহ্ণ
সাতক্ষীরা জেলার শ্রেষ্ঠ ওসি শ্যামনগর থানার খালেদুর রহমান
প্রকাশিতঃ ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, বুধ, ৮:৪৫ অপরাহ্ণ
“জামায়াত হারেনি, বরং হারানো হয়েছে জামায়াতকে” – মুহাদ্দিস আব্দুল...
প্রকাশিতঃ ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, বুধ, ৮:৪৩ অপরাহ্ণ